ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে। দেশে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইলেকশন অবজারভার সোসাইটি (EOS) সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের জন্য দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে পর্যবেক্ষক মোতায়েন করে ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। সংগঠনটি কোনো ধরনের অর্থায়ন ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করেছে।
নির্বাচন আয়োজনের জন্য যথেষ্ট সময় থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছুটা সময় লেগেছিল। নির্বাচনের আগে কিছু অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করলেও কমিশন একাধিক ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে নির্বাচনের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের আগে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়ায় কিছু বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে প্রতীকের অবস্থান পরিবর্তন, শাপলা প্রতীকের অন্তর্ভুক্তি, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিধিনিষেধ নিয়ে সংশোধন প্রয়োজন হয়েছিল। কমিশন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত বিবেচনা করে কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেও এটি ইসির ভাবমূর্তিতে সামান্য ক্ষতি করেছে।
কিছু কেন্দ্রে বুথ স্থাপন ও ভোটার বণ্টন সুষম হয়নি। নিচতলা ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও উপরের তলায় বুথ স্থাপন করা হয়েছিল, যা বয়স্ক ও অসুস্থ ভোটারের জন্য কষ্টসাধ্য ছিল। রাজধানী ঢাকায় ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল, যা ভবিষ্যতে বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। সরকারের “হ্যাঁ ভোট” প্রচারণা সংক্রান্ত ব্যয় এবং পরে কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, কিছু শক্তিশালী প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন এবং পারস্পরিক ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের আগের রাতে গুজব ছড়ানোর এবং ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা দেখা গেলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল। পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী দৃঢ় ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। কিছু ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া কোনো প্রাণহানি হয়নি।
EOS-এর পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কোনো আসনে ফলাফল প্রভাবিত করার মতো গুরুতর অনিয়ম চোখে পড়েনি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও একই ধরনের মূল্যায়ন জানিয়েছেন। নারী ও তরুণ ভোটারের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের আগ্রহ ও সম্পৃক্ততার প্রতিফলন।
নির্বাচনের পরের দিন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার খবরও পাওয়া গেছে। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় সহিংসতা, মুন্সিগঞ্জে প্রাণহানি এবং ফেনী ও টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। EOS আগামী সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ভোটকেন্দ্র নির্ধারণে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভোটারের সুবিধার্থে নিচতলায় বুথ স্থাপন এবং বয়সভিত্তিক কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া আচরণবিধি বাস্তবায়নে কঠোরতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় এবং পর্যবেক্ষকদের যাতায়ত ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
EOS-এর সভাপতি ইকবাল হোসাইন হীরা এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম আপ্পি, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আমিন, সহ-সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. নাসির উদ্দিন শাহ, নির্বাহী সদস্য মাহমুদা পারভীন, হিন্দু মহাজোটের সম্পাদক ড. মৃণ্ময় রায় এবং শান্তি সভা ন্যাশনাল খাতর ফাউন্ডেশনের সম্পাদক রুহুল আমিন।